আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে সব নেতা একই রকম ভাষা ব্যবহার করেন না। কেউ সরাসরি আক্রমণাত্মক টোনে কথা বলেন, আবার কেউ নীরব থেকে—সময়ে-অসময়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেন। সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা মন্তব্য ও পদক্ষেপ ভারতের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে—যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিজের নামে নেওয়া, উচ্চ শুল্কের কথা বলা, এমনকি মার্কিন IT খাতে ভারতীয় কর্মীদের প্রতি কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত। প্রশ্নটা তখন উঠেই যায়: “মোদী চুপ কেন?” সমর্থকের চোখে এর উত্তরটা কৌশল, ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভারসাম্যে লুকিয়ে আছে।
ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক স্টাইল বনাম মোদীর কৌশল
ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্টাইল সবসময় স্পষ্ট ও উচ্চকণ্ঠ। ক্যামেরার সামনে দৃঢ় বার্তা—এটাই তাঁর শক্তি। অপরদিকে মোদীর পদ্ধতি অনেকটা “স্ট্র্যাটেজিক সাইলেন্স”—যেখানে প্রকাশ্য বক্তৃতা নয়, বরং ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি, ট্র্যাক–২ আলোচনার মতো পথ বেছে নেওয়া হয়। এতে হেডলাইন কম, কিন্তু ফলাফল স্থায়ী হতে পারে। আন্তর্জাতিক মিত্রতা, প্রতিরক্ষা চুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা—এসব প্রাপ্তির জন্য কম কথা, বেশি কাজ—এটাই মোদী সরকারের টোন।
নীরবতা কি দুর্বলতা? সমর্থকের যুক্তি
- কূটনৈতিক ভারসাম্য: ভারত–আমেরিকা–ইউরোপ–রাশিয়া—সব অক্ষেই একসঙ্গে কাজ করতে হয়। প্রকাশ্যে কড়া প্রতিক্রিয়া দিলে অন্য অক্ষ দুর্বল হয়।
- অর্থনৈতিক বাস্তবতা: আমেরিকা বড় রপ্তানি বাজার এবং প্রযুক্তি অংশীদার। সরাসরি সংঘাতে গেলে চাকরি ও বিনিয়োগ—দুটিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- সময়ের কৌশল: বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। সঠিক মুহূর্তে সঠিক চাপ প্রয়োগ করলে ফলাফল ভালো হয়—এটাই ট্যাকটিকাল পেশেন্স।
- দেশীয় অগ্রাধিকার: অবকাঠামো, উৎপাদন, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম—এগুলো শক্ত করলে বাইরের চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
মোদী সরকারের রোডম্যাপ: সমর্থকের দৃষ্টিতে “করণীয়”
১) Atmanirbhar Bharat: আমদানি-নির্ভরতা কমানো
আত্মনির্ভর ভারত মানে শুধু স্লোগান নয়—কম্পোনেন্ট থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত দেশেই উৎপাদন। ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, সৌরশক্তি—সবখানেই লোকাল ভ্যালু চেইন গড়া হচ্ছে। আমেরিকা বা অন্য দেশের শুল্ক নীতির প্রভাব তখন সীমিত হয়।
২) Make in India: গ্লোবাল কারখানা হিসেবে ভারত
বহুজাতিক কোম্পানির জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেন্টিভ, দ্রুত অনুমোদন, লজিস্টিক করিডর—এগুলো বিদেশি বিনিয়োগ টানছে। জাপান, কোরিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে প্ল্যান্ট করছে। ফলে চাকরি বাড়ছে, রপ্তানি বেসও হচ্ছে শক্ত।
৩) Digital India & IT শক্তি: “চাকরি বাইরে নয়, বাজার ভেতরে”
ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া ভিসা নীতির সময়ে সমর্থকের যুক্তি—দেশীয় IT/স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের স্কেল বাড়াতে হবে। ক্লাউড, AI, সাইবার সিকিউরিটি, ফিনটেক—এই সব সেক্টরে ভারতীয় কোম্পানির বাজার তৈরি হলে চাকরির জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
৪) বহুমুখী কূটনীতি (Multi-Alignment)
BRICS, SCO, Quad, I2U2—বহু ফোরামে ভারত সমান্তরালভাবে কাজ করছে। জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে, প্রযুক্তি জাপান/ইউরোপ থেকে, প্রতিরক্ষা কো-ডেভেলপমেন্ট বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে—এই বুননটাই ভারতের নিরাপত্তা।
৫) প্রতিরক্ষা আত্মনির্ভরতা
ড্রোন, আর্টিলারি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, নৌবাহিনীর প্ল্যাটফর্ম—অনেক কিছুই এখন দেশেই ডিজাইন–উৎপাদন হচ্ছে। আমদানি বিল কমে, রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়—আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় এটি বড় ঢাল।
ট্রাম্পের শুল্ক–চাকরি ইস্যুতে সম্ভাব্য পাল্টা-কৌশল
- স্মার্ট ট্যারিফ ডিপ্লোম্যাসি: যেখানে দরকার মিরর ট্যারিফ, যেখানে লাভজনক সেখানে ট্যারিফ-ফরবিয়ারেন্স—অর্থাৎ বাছাই করে প্রতিক্রিয়া।
- বাজার বৈচিত্র্য: আফ্রিকা–ল্যাটিন আমেরিকা–দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি বাড়িয়ে মার্কিন নির্ভরতা কমানো।
- ভ্যালু-চেইন শিফট: শুধু ফাইনাল গুডস নয়, কম্পোনেন্ট–ডিজাইন–R&D-তে ভারতকে অপরিহার্য করা, যাতে উচ্চ শুল্ক দিলেও কোম্পানিগুলো ভারত ছাড়া চলতে না পারে।
- ট্যালেন্ট অনশোরিং: গ্লোবাল ক্যাপ্টিভ সেন্টার (GCC) এবং প্রোডাক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং হাবে বহুজাতিকদের ভারতেই টিম বাড়াতে উৎসাহ—“জব ইজ ইন ইন্ডিয়া”।
উপসংহার: সমর্থকের সারকথা
প্রকাশ্যে নীরব থাকা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়—এটি বহু ক্ষেত্রে শক্তির লক্ষণ। ট্রাম্পের মতো উচ্চকণ্ঠ রাজনীতির বিপরীতে মোদী সরকারের পদ্ধতি হলো স্থির, ফলাফলমুখী, এবং ধাপে-ধাপে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করা। আত্মনির্ভরতা, বহুমুখী কূটনীতি, প্রতিরক্ষা–প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা—এই তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে ভারত বাইরের শোরগোলের চেয়ে ভেতরের শক্তি বাড়াচ্ছে। সমর্থকের দৃষ্টিতে এটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ: কম কথা, বেশি কাজ; তা-ও আবার ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে।
Also Read :


[…] ট্রামপের দাদাগিরিতে! Modi Silent কেন? […]